শাইখ আলী তানতাভী রহিমাহুল্লাহ
এক বরেণ্য সাহিত্যিক ও ইসলামী চিন্তাবিদ
শাইখ আলী তানতাওয়ী ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিরীয় ইসলামী চিন্তাবিদ, পৃথিবীবিখ্যাত আরব সাহিত্যিক, বিচারক, ইতিহাসবিদ এবং দাঈ। সারা জীবনই তিনি মুসলিম উম্মাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দরদ থেকে কাজ করে গেছেন।
জন্ম, বংশ ও শিক্ষা
তিনি ১৯০৯ সালের ১২ জুন (১৩২৭ হিজরি) সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের এক সম্ভ্রান্ত ইলমী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শায়খ মুস্তফা তানতাওয়ী এবং দাদা শায়খ মুহাম্মাদ তানতাওয়ী উভয়েই বিখ্যাত আলেম ছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৩৩ সালে সফলতার সাথে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
কর্মজীবন ও বিচারব্যবস্থা
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি সিরিয়া ও ইরাকের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেন। ১৯৪১ সালে তিনি সিরিয়ায় বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান এবং দীর্ঘ ২৫ বছর অত্যন্ত সততা, সাহসিকতা ও দক্ষতার সাথে সেই দায়িত্ব পালন করেন।
সৌদি আরবে হিজরত ও অধ্যাপনা
জন্মভূমি সিরিয়ায় রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশ এবং জুলুম ও নির্যাতনের কারণে ১৯৬৩ সালে (১৩৮৩ হিজরি) তিনি সৌদি আরবে হিজরত করেন। সৌদি আরবে আসার পর তিনি প্রথম দিকে রাজধানী রিয়াদে অধ্যাপনা শুরু করেন। সেখানে তিনি মূলত কুল্লিয়াতুশ শরীয়াহ (শরীয়াহ অনুষদ) এবং কুল্লিয়াতুল লুগাহ আল-আরাবিয়্যাহ (আরবি ভাষা অনুষদ) এ শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন। তাঁর অগাধ জ্ঞান এবং সাহিত্যের রসে সিক্ত পাঠদান পদ্ধতি খুব দ্রুত ছাত্রদের মাঝে তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে।
রিয়াদে কিছুদিন থাকার পর ১৯৬৪ সালের (১৩৮৪ হিজরি) দিকে তিনি পবিত্র মক্কায় চলে যান। পবিত্র মক্কা ও মদিনার সান্নিধ্যে, কালো গিলাফের ছায়ায় তিনি তাঁর জীবনের সেরা সময়গুলো অতিবাহিত করেন। মক্কায় তিনি উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন কুল্লিয়াতুত তারবিয়াহ (শিক্ষা অনুষদ) এবং কুল্লিয়াতুশ শরীয়াহ তে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে তিনি ছাত্রদের ইসলামিক কালচার বা ইসলামী সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পাঠদান করতেন। তাঁর ক্লাসে শুধু নির্দিষ্ট অনুষদের নয়, বরং অন্যান্য অনুষদের ছাত্ররাও তাঁর আলোচনা শোনার জন্য ভিড় করত।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতা থেকে বৃহত্তর দাওয়াহর ময়দানে
মক্কায় কিছুদিন প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যাপনা করার পর তাঁর জীবনের মোড় কিছুটা ঘুরে যায়। সৌদি আরবের শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁকে ইসলামী গণসচেতনতা (التوعية الإسلامية) নামক একটি বিশাল কর্মসূচির দায়িত্ব অর্পণ করে। এই গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথাগত শিক্ষকতা ছেড়ে দেন। এরপর তিনি সমগ্র সৌদি আরবের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট এবং স্কুলগুলোতে ঘুরে ঘুরে লেকচার ও বক্তৃতা দিতে শুরু করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল নতুন প্রজন্মকে ইসলামী মূল্যবোধ ও আদর্শের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত করা।
মক্কায় অবস্থানকালে আনুষ্ঠানিক শিক্ষকতার বাইরেও তিনি সাধারণ মানুষের শিক্ষক হয়ে ওঠেন। তিনি প্রতিদিন মসজিদুল হারামে (কাবা চত্বরে) একটি নির্দিষ্ট মজলিসে এবং নিজের বাসগৃহে বসে সাধারণ মানুষের বিভিন্ন জটিল প্রশ্নের উত্তর ও ফতোয়া দিতেন।
গণমাধ্যম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা
তিনি যেমন সুন্দর করে লিখতেন, তাঁর কথা বলার ভঙ্গিও ছিল ঠিক তেমনই সুন্দর ও সাবলীল। জটিল বিষয়গুলোও খুব সহজে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন। তাঁর মনকাড়া উপস্থাপনা ও বিবেক জাগানো কথা শুনলে মনে হতো কোনো দয়ালু পিতা, স্নেহশীল দাদা বা প্রাজ্ঞ অভিভাবক উপদেশ দিচ্ছেন।
এ সময়েই তিনি গণমাধ্যমকে তাঁর শিক্ষাদানের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন। তিনি তাঁর বিশ্ববিখ্যাত রেডিও প্রোগ্রাম “মাসায়েল ওয়া মুশকিলাত" এবং টেলিভিশন প্রোগ্রাম “নূরুন ওয়া হিদায়াহ" শুরু করেন। পাশাপাশি তাঁর উপস্থাপনায় “নূরুন আলাদ দারব" এর মতো ইসলামি অনুষ্ঠানগুলোও ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। এই প্রোগ্রামগুলোর মাধ্যমে তিনি পুরো সৌদি আরব ও আরব বিশ্বের ঘরে ঘরে ইসলামী শিক্ষা ও দিকনির্দেশনা পৌঁছে দেন, যা প্রায় সিকি শতাব্দী ধরে চলেছিল। মূলত রিয়াদ ও মক্কার এই অধ্যাপনা ও দাওয়াতি জীবনই তাঁকে কেবল একজন সিরিয়ান সাহিত্যিক থেকে পুরো আরব বিশ্বের একজন প্রাজ্ঞ অভিভাবকে পরিণত করেছিল।
সাহিত্যকর্ম
আরবি সাহিত্যে তাঁর অবদান অমূল্য। তাঁর একেকটি কিতাব যেন একেকটি লাইব্রেরি। তাঁর লেখা পড়লে পাঠকের মনে হয় যেন কোনো সুবাসিত ও পাখির কলরবে মুখরিত বাগানে হাঁটছেন। কখনো বা তাঁর লেখায় হারানো ঐতিহ্যের ভাঙা মিনারচূড়ার কথা পড়ে পাঠকের চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়ে । তাঁর হৃদয়গ্রাহী ভাষা মুগ্ধ পাঠককে যেন পরকালের চির শান্তির জান্নাতে নিয়ে যায়।
তিনি খুব বেশি সংখ্যক বই লেখেননি, তবে যা লিখেছেন তা খাঁটি সোনার মতোই মূল্যবান। তাঁর উল্লেখযোগ্য কিতাবগুলোর মধ্যে রয়েছে:
· যিকরায়াত (১ থেকে ৮ খণ্ডে রচিত আত্মজীবনী)
· হুতাফুল মাজদি (গৌরবঝরা দিনগুলো)
· রিজালুম মিনাত তারিখ (ইতিহাসের সেরা যাঁরা)
· মিন নাফাহাতিল হারাম (হারামের সৌরভ)
· কিসাসুন মিনাত তারিখ (ইতিহাসের পাতা থেকে গল্প)
· মা'আন নাস (মানুষের সাথে)
· আবু বকর সিদ্দিক (রা.) এবং উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) এর জীবনী
ইন্তেকাল
এই প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ ১৯৯৯ সালের ১৮ জুন (১৪২০ হিজরি) সৌদি আরবের জেদ্দায় প্রায় ৯০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। মক্কার মসজিদুল হারামে তাঁর জানাযা অনুষ্ঠিত হয় এবং পুণ্যভূমি মক্কাতেই তাঁকে দাফন করা হয়।
।