জন্ম ও শৈশব
জন্ম: তিনি ১৯৪ হিজরির ১৩ই শাওয়াল (৮১০ খ্রিষ্টাব্দ) জুমুআর দিন বর্তমান উজবেকিস্তানের বিখ্যাত শহর 'বুখারা'-তে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নামানুসারেই তাঁকে 'বুখারী' বলা হয়।
পারিবারিক পরিবেশ: তাঁর পিতা ইসমাঈলও একজন স্বনামধন্য মুহাদ্দিস ছিলেন। শৈশবেই তিনি পিতৃহারা হন এবং দ্বীনদার মায়ের পরম যত্নে লালিত-পালিত হন।
দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়া: ছোটবেলায় এক কঠিন রোগে তাঁর দৃষ্টিশক্তি চলে গিয়েছিল। তাঁর মায়ের অবিরাম কান্না ও আকুল দোয়ায় আল্লাহ তাআলা তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন।
শিক্ষার সূচনা: মাত্র ১০ বছর বয়স থেকেই তিনি মক্তবে হাদিস মুখস্থ করা শুরু করেন এবং কৈশোরে পদার্পণের আগেই ৭০ হাজার হাদিস তাঁর আয়ত্তে চলে আসে।
জ্ঞানার্জন ও বিশ্বভ্রমণ
মক্কায় সফর: ১৬ বছর বয়সে তিনি মা ও বড় ভাইয়ের সাথে হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় গমন করেন। হজ শেষে মা ও ভাই ফিরে গেলেও জ্ঞানার্জনের পিপাসায় তিনি মক্কায় থেকে যান।
ইলমী সফর: মক্কা ও মদীনায় কয়েক বছর অধ্যয়নের পর হাদিস সংগ্রহের সন্ধানে তিনি সিরিয়া, মিশর, বসরা, কুফা, বাগদাদ, নিশাপুরসহ তৎকালীন ইসলামী বিশ্বের প্রায় সকল প্রধান জ্ঞানকেন্দ্রে সফর করেন।
শিক্ষকমণ্ডলী: তিনি প্রায় ১,০৮০ জন প্রখ্যাত মুহাদ্দিসের কাছ থেকে হাদিস শ্রবণ ও সংগ্রহ করেছেন। তাঁর অন্যতম শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, আলী ইবনুল মাদীনী, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ প্রমুখ।
অনন্য মেধা ও স্মৃতিশক্তি
ইমাম বুখারী (র.)-এর স্মরণশক্তি ছিল প্রবাদতুল্য। বাগদাদের মুহাদ্দিসগণ একবার তাঁর মেধা পরীক্ষার জন্য ১০০টি হাদিসের সনদ (বর্ণনাকারী সূত্র) ও মতন (মূল পাঠ) ইচ্ছাকৃতভাবে উলটপালট করে ১০ জন ব্যক্তির মাধ্যমে তাঁকে শোনান। তিনি শান্তভাবে সব শুনে প্রতিটি হাদিসের ভুলগুলো ধরিয়ে দেন এবং ক্রমান্বয়ে ১০০টি হাদিসের সঠিক সনদ ও মতন হুবহু মুখস্থ শুনিয়ে দেন।
অমর কীর্তি: সহীহ বুখারী
তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো 'আল-জামি আস-সহীহ', যা সংক্ষেপে 'সহীহ বুখারী' নামে পরিচিত।
প্রেক্ষাপট: তাঁর শিক্ষক ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ একবার এমন একটি গ্রন্থ সংকলনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন যেখানে শুধু বিশুদ্ধ হাদিস থাকবে। এই কথা ইমাম বুখারীর মনে গভীরভাবে দাগ কাটে।
সংকলন প্রক্রিয়া: তিনি প্রায় ৬ লক্ষ হাদিস থেকে যাচাই-বাছাই করে দীর্ঘ ১৬ বছরের নিরলস সাধনায় এই গ্রন্থটি রচনা করেন।
আধ্যাত্মিক সাধনা: প্রতিটি হাদিস গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করার আগে তিনি গোসল করে পবিত্র হতেন, দুই রাকাত ইস্তিখারার নামাজ আদায় করতেন এবং হাদিসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হলেই তা খাতায় লিখতেন।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলি
সহীহ বুখারী ছাড়াও তিনি অনেক মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
আল-আদাবুল মুফরাদ (শিষ্টাচার বিষয়ক)
আত-তারিখুল কাবীর (হাদিস বর্ণনাকারীদের জীবনী)
আত-তারিখুল আসগার
খালকু আফয়ালিল ইবাদ
বিখ্যাত ছাত্রবৃন্দ
হাদিস শাস্ত্রে তাঁর ছাত্রসংখ্যা অগণিত। তাঁর মজলিসে হাজার হাজার শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকতেন। তাঁর প্রখ্যাত ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন:
ইমাম মুসলিম (সহীহ মুসলিম-এর রচয়িতা)
ইমাম তিরমিযী (সুনান আত-তিরমিযী-এর রচয়িতা)
ইমাম আবু দাউদ
ইমাম নাসাঈ
ইন্তেকাল
জীবনের শেষ পর্যায়ে বুখারার তৎকালীন শাসকের একটি অন্যায় আবদার (রাজদরবারে গিয়ে সন্তানদের হাদিস পড়ানো) তিনি প্রত্যাখ্যান করেন, কারণ তিনি জ্ঞানকে দরবারে নিয়ে যেতে রাজি ছিলেন না। ফলে তাঁর সাথে শাসকের মতবিরোধ দেখা দেয় এবং তিনি মাতৃভূমি ত্যাগ করে সমরকন্দের নিকটবর্তী 'খরতঙ্গ' নামক গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। ২৫৬ হিজরির ১লা শাওয়াল, পবিত্র ঈদুল ফিতরের রাতে (৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে) ৬২ বছর বয়সে এই মহান সাধক ইন্তেকাল করেন। খরতঙ্গ গ্রামেই তাঁকে সমাহিত করা হয়।